প্রশ্নবিদ্ধ সেনাবাহিনীর সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকার: সাজেকে চলমান সংকটের উপর প্রতিবেদন

15



প্রশ্নবিদ্ধ সেনাবাহিনীর সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকার:

রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন সাজেক ইউনিয়নে
চলমান সংকটের উপর প্রতিবেদন ও কতিপয় সুপারিশ

৩ নভেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার

ভূমিকা:

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলি এক গভীর মানবিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করেছে। বাহ্যিকভাবে সাজেক একটি মনোরম প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও, এর আড়ালে রয়েছে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক প্রান্তিকীকরণ, ব্যাপক সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস। ২০০৮ এবং ২০১০ সালে সাজেকে পাহাড়িদের ওপর সেনা-সেটলাররা সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়েছিল। এতে শতশত ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়, এবং সেনাবাহিনীর গুলিতে একাধিক পাহাড়ি নিহত হন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সার্বিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের হলেও, এই প্রতিবেদন নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। সম্প্রতি আগস্ট থেকে অক্টোবর ২০২৬ সময়কালে সাজেকে ঘটে যাওয়া নির্দিষ্ট ঘটনাবলি থেকে দেখা যায় যে, তথাকথিত সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী জেএসএস (সন্তু গ্রুপ)-এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আঁতাতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

এই রিপোর্টের প্রধান লক্ষ্য সাজেক অঞ্চলে সংঘটিত এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরা এবং এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা খতিয়ে দেখে প্রধান প্রশ্নটির উত্তর অন্বেষণ করা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কি সত্যিই সন্ত্রাস দমনে কাজ করছে?

ঘটনাক্রম:

ক) ফেরদৌস চাকমা অপহরণ ঘটনা এবং জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র দলের সাথে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক

অপহরণের শিকার ফেরদৌস চাকমা। ছবি: সিএইচটি নিউজ

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক উপত্যকার মতো একটি প্রান্তিক এলাকায় সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে সশস্ত্র সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি হয়ে আছে, তার স্পষ্ট উদাহরণ হলো গত ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সংঘটিত ফেরদৌস চাকমা অপহরণের ঘটনা। এই একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, একটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাবাহিনী এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র দল জেএসএস যৌথভাবে কীভাবে সাজেকের সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে।

৩ আগস্ট ২০২৬ সাজেকের পরিচিত রেস্তোরাঁ ‘Same Place Restaurant’ থেকে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস সন্তু গ্রুপ)-এর একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী মোটরসাইকেলে এসে অতর্কিতভাবে ফেরদৌস চাকমাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে উদয়পুরের দিকে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, উদয়পুর ও কংলাক এলাকাটি পুরোপুরি জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডারদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে

পরিচালিত হয়ে থাকে। এর প্রেক্ষিতে ৭ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে অপহৃত ফেরদৌস চাকমার স্ত্রী যতনা চাকমা এবং তার শ্বশুর মনি চাকমা থানায় মামলা দায়ের করতে যাওয়ার পথে বাঘাইহাট সেনা জোনের ফিল্ড সিকিউরিটি শাখার দুই সেনাসদস্য মো. হুমায়ুন ও মো. জসিম উজোবাজারে তাদের পথরোধ করে থানায় যেতে বাধা দেন। সেনাসদস্য হুমায়ুন অপহৃতের স্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন যে তার স্বামী নিরাপদেই আছেন এবং বাড়িতেই অবস্থান করছেন। যখন যতনা চাকমা এর প্রমাণ চান, তখন হুমায়ুন নিজের মোবাইল ফোন থেকেই জেএসএস-এর সশস্ত্র কমান্ডার বিক্রম চাকমাকে কল করেন। তিনি তাকে (বিক্রমকে) ধমকের সুরে বলেন, “আমার টাকায়, আমার নিরাপত্তায় রয়েছেন, অথচ ফেরদৌস চাকমাকে অপহরণের বিষয়টি কেন বলেননি?”

ফোনের ওপাশ থেকে জেএসএস কমান্ডার বিক্রম চাকমা অপরাধ স্বীকার করে বলেন, “স্যার! স্যার! আমরা তুলে এনেছি, ফেরদৌস আমার কাছে রয়েছে।” এই কথোপকথন থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, বাঘাইহাট সেনা জোনের গোয়েন্দা সদস্যের সাথে জেএসএস-এর সশস্ত্র কমান্ডারের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং তাদের জ্ঞাতসারেই সাজেকে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটে থাকে।

অপহৃতের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়লে সেনাসদস্য হুমায়ুন তাকে মামলা না করার জন্য চাপ দেন এবং দু-এক দিনের মধ্যে স্বামীকে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার ভুয়া আশ্বাস দিয়ে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে এর প্রতিবাদ জানালে মো. হুমায়ুন উদ্ধতভাবে বলে ওঠেন, “আমি তোমার স্বামীকে উদ্ধারের জন্য চাকরি করতে আসিনি!”

এর ঠিক ঘণ্টাখানেক পর সেনাবাহিনীর অনুগত কিছু নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয় যে, সেনাবাহিনী ফেরদৌস চাকমাকে নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু নেপথ্যের সত্য হলো, এটি কোনো উদ্ধার অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল জেএসএস ও সেনাবাহিনীর একটি সাজানো নাটক। সেনাবাহিনীর গোপন নির্দেশনা অনুযায়ী জেএসএস সন্ত্রাসীরা ছোট কংলাক এলাকায় ফেরদৌসকে বসিয়ে রাখে এবং সেনাসদস্যরা সেখানে গিয়ে তাকে নাটকীয়ভাবে ‘উদ্ধার’ করার ছবি তোলে, যা অপহরণকারী সন্ত্রাসীদের সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দেয়। এই নাটকের রেশ কাটতে না কাটতেই জেএসএস-এর সশস্ত্র সদস্য পরিবর্তন চাকমা অপহৃতের শ্বশুরকে জানিয়ে দেয় যে, ফেরদৌস আর বাঘাইহাটে ফিরবে না এবং তাকে জেএসএস-এর কঠোর নজরদারিতে ‘এরিয়া বন্দি’ করে রাখা হয়েছে। এমনকি তাদের পরিবারের সবার মোবাইল ফোনও জেএসএস নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেয়।

এই ঘটনাটি কয়েকটি বিষয়কে তুলে ধরে: এক, সাজেকের সাধারণ জনগণের নিরাপত্তাহীনতা। দুই, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে বোঝাপড়ার সম্পর্ক; এবং তিন, আইনের আশ্রয়লাভের ক্ষেত্রে বাধা ও অপরাধীদের দায়মুক্তি। এক কথায় এই ঘটনা সাজেক অঞ্চলের ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরে, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক অপরাধের শিকার হয়ে আইনি সহায়তা চাইতে গিয়ে খোদ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারাই বাধা পায়।

খ) সাজেক কলেজ ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা

সাজেক এলাকার দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ কীভাবে বারবার রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সামরিক শক্তির বাধার মুখে পড়েছে, তার একটি উদাহরণ হলো ‘সাজেক কলেজ’ প্রতিষ্ঠার ঘটনা।

সাজেক কলেজ কার্যক্রম বন্ধ করতে সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয় বনভিাগ। ছবি> সিএইচটি নিউজ

২০২৪ সালের সাজেকের সাধারণ এলাকাবাসী সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে কলেজটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি তৈরির শুরু থেকেই বন বিভাগ এবং সেনাবাহিনী বিভিন্ন অজুহাতে তাতে বাধা দিতে শুরু করে। এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১৩ জুন বন বিভাগের লোকজন নির্মাণাধীন কলেজ প্রাঙ্গণে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়, যেখানে এটিকে সংরক্ষিত বনভূমি উল্লেখ করে অনুমতি ছাড়া স্থাপন নির্মাণকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলা হয়।

অথচ সাজেকের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যে সাজেকে পাহাড়ি আদিবাসীদের জোরপূর্বক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে বিশাল সব বাণিজ্যিক রিসোর্ট ও বিলাসবহুল কটেজ গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলোর বেলায় বন বিভাগের কোনো আইনি বাধা দেখা যায় না। এমনকি সাজেক এলাকার স্থানীয় জনমিতির সাথে সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও ২০২০ সালের দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে একটি বিশাল ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’ নির্মিত হয়েছে। অথচ বাণিজ্যিক রিসোর্ট বা মসজিদের বেলায় সংরক্ষিত বনভূমির আইন বাধা না হলেও, গরিব মানুষের সন্তানেরা একটু পড়াশোনা করবে, এমন একটি কলেজ তৈরির বেলায় বন বিভাগ হঠাৎ অত্যন্ত তৎপর ও কঠোর হয়ে ওঠে।

নানা বাধা অতিক্রম করে চলতি বছরের ১০ আগস্ট যখন কলেজ করণিক ও শিক্ষকেরা পাঠদান চালুর চূড়ান্ত উদ্যোগ নেন, তখন সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বন বিভাগ যৌথভাবে সেখানে হাজির হয়ে বাধা দেয়। বাঘাইহাট সেনা জোনের টু-আইসি মেজর মো. সালমান সিদ্দিককে অথবা জোন কমান্ডারকে সাজেক কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে বসানোর জন্য কঠোর চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাদের পরিষ্কার কথা ছিল, সেনা কর্মকর্তাকেই পর্ষদের সভাপতি করতে হবে, অন্যথায় পাঠদান চলতে দেওয়া হবে না এবং সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য মুরব্বীদের বিরুদ্ধে ৫০ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা ঠুকে দেওয়া হবে।

পরবর্তীতে স্থানীয় প্রতিনিধিরা ওসির শরণাপন্ন হলে, ওসি তোফাজ্জল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশের কোনো ক্ষমতা নেই। তিনি পরামর্শ দেন যে সাধারণ মানুষের জন্য সেনাবাহিনীর সাথে বোঝাপড়া করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অর্থাৎ, সেখানে বেসামরিক প্রশাসনের কোনো স্বাধীন সত্তা নেই, বরং সামরিক কর্তৃত্বই শেষ কথা। তা সত্ত্বেও সেদিন এলাকাবাসী সাহসের সাথে পুলিশ ও বন বিভাগের সামনে নির্দিষ্ট যুক্তি তুলে ধরলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু এরপরেও কলেজকে ঘিরে সামরিক জোনের অদৃশ্য চাপ ও হয়রানি অব্যাহত থাকে।

গ) সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় সশস্ত্র গ্রুপ জেএসএসকে নিয়ে আসা

সাজেক পর্যটন এলাকায় প্রশাসনের নাকের ডগায় একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী কীভাবে অবাধে বিচরণ করতে পারে, তার প্রমাণ মেলে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৩১ আগস্ট তারিখে জেএসএস সন্তু গ্রুপের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জনের একটি সশস্ত্র দল জিপ গাড়ীযোগে এসে হাজির হয় এবং মাচলং আর্মি ক্যাম্পের অত্যন্ত কাছে এবং দুটি সেনা ক্যাম্পের মধ্যবর্তী এলাকা যেমন ব্রিজপাড়া, নুওপাড়া ও শিবপাড়ায় প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়।

মাচলং আর্মি ক্যাম্প থেকে মাত্র এক থেকে তিন মাইলের এই স্বল্প দূরত্বের মধ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বিনা বাধায় অবস্থান করলেও, ১ সেপ্টেম্বর সেনাসদস্যদের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তাদের জন্য খাদ্য, পানি ও প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করা হয়। সাজেক কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বন্ধ করা এবং স্থানীয় জনগণের ন্যায়সংগত আন্দোলন দমন করার উদ্দেশ্যেই এই সশস্ত্র গ্রুপটিকে সাজেকিতে এসে বসানো হয়েছে বলে এলাকাবাসীর জোরালো অভিযোগ রয়েছে।

ঘ) শিশু কস্মিতা ত্রিপুরা জখম

সাজেক উপত্যকার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে সাধারণ মানুষের জীবন যে কতটা নিরাপত্তাহীন, তার মর্মান্তিক চিত্র ফুটে ওঠে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের ঘটনা। ওই দিন সকালে সাজেকের মাচলং নোয়াপাড়া এলাকায় জেএসএস সন্তু গ্রুপের একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী কোনো পূর্ব উস্কানি ছাড়াই অতর্কিতভাবে এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার শুরু করে।

জেএসএস সন্তু গ্রুপের এলোপাতাড়ি গুলিতে আহত ৮ বছরের শিশু কস্মিতা ত্রিপুরা।

সন্ত্রাসীদের এই বেপরোয়া গুলিবর্ষণের সময় মাজলঙের পার্শ্ববর্তী ১নং মন্দিরছড়া গ্রামের বাসিন্দা উলেন্দ্র ত্রিপুরার ৮ বছরের ছোট শিশু কস্মিতা ত্রিপুরা ঘরের ভেতরে অবস্থান করছিল। সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া একটি গুলি তার বাম হাতে লেগে সে গুরুতর আহত হয়। পরিবারের সদস্যরা তাকে স্থানীয় ফার্মেসিতে নিয়ে গেলে চিকিৎসকের সহায়তায় তার ক্ষতবিক্ষত হাত থেকে গুলি বের করা হয়। একটি নিষ্পাপ শিশু নিজের ঘরে বসে থেকেও এভাবে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হওয়ায় গোটা সাজেক জুড়েই তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

উদ্বেগের বিষয় হলো, যে এলাকায় এই সন্ত্রাসীরা ব্রাশফায়ার করে, সেখান থেকে সামান্য দূরেই মাচলং আর্মি ক্যাম্প ও নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান রয়েছে। ক্যাম্পের এত কাছাকাছি এলাকায় সশস্ত্র তাণ্ডব চললেও আইনৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষনিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এই নিষ্ক্রিয়তা স্থানীয় জনগণের মনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নীরব সম্মতি বা প্রচ্ছায়া না থাকলে সন্ত্রাসীরা এমন বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড চালানোর সাহস পেত না।

ঙ) জুমচাষীদের ওপর হামলা, হুমকি ও মোবাইল ফোন জব্দ

গত ১০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সাজেকের মাচলং এলাকার মন্দিরছড়া অঞ্চলে জুমচাষী সাধারণ মানুষের ওপর জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নির্বচারে গুলিবর্ষণ করে। ওই দিন সকালে মাজলঙের থালকুম্ভস্থ এলাকার বাসিন্দা চিত্তো চাকমা (৩৯) ও তার স্ত্রী চিপুদি চাকমা (৩৬) নিজেদের জুম ক্ষেতে ধান কাটতে গেলে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই সন্ত্রাসীরা তাদের লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার শুরু করে। স্বামী-স্ত্রী কোন রকমে পালিয়ে জীবন বাঁচান। এলাকাবাসী মনে করেন, সন্ত্রাসীরা নতুন এলাকায় প্রবেশ করার সময় সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করতেই এভাবে বিনা উস্কানিতে গুলিবর্ষণ করে থাকে। এর পাশাপাশি সাজেকের ভুয়োছড়ি, লাম্বাবাক ও উজ্জেংছড়ি এলাকায় জেএসএস সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়ে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনগুলো জোরপূর্বক কেড়ে নিয়েছে। সন্ত্রাসীরা স্থানীয়দের হুমকি দিয়ে জানিয়েছে যে, কারো মোবাইল ফোনে ইউপিডিএফ বা অন্য কোনো পক্ষের সাথে যোগাযোগের সামান্যতম প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে নির্মমভাবে মেরে ফেলা হবে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের এই অবাধ তৎপরতা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

চ) বাড়িঘরে তল্লাশি ও অগ্নিসংযোগ

গত ১৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে রাঙামাটির সাজেকের গঙ্গারাম এলাকার নাঙ্গলমারা গ্রামে সেনাবাহিনীর একটি দল অতর্কিতভাবে হানা দেয়। গঙ্গারাম টাইগার টিলা ক্যাম্প থেকে ১৯ জন সেনাসদস্য কোনো কারণ বা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই গ্রামের বাসিন্দা বকুল চাকমার বাড়ি ঘেরাও করে। সেনাসদস্যরা “ইউপিডিএফ কোথায় মিটিং করছে” এমন সব অবান্তর প্রশ্ন তুলে নিরীহ পরিবারটিকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।

পরবর্তীতে ৭ সেপ্টেম্বর সাজেকের মাচলং এলাকায় সেনাবাহিনী আরও বড় পরিসরে দমন-পীড়ন অভিযান চালায়। ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে বাঘাইহাট জোন থেকে চারটি বড় গাড়ি ও নয়টি পিকআপ ভ্যানে করে বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য মাজলং বাজারে প্রবেশ করেন। সেনারা সেতুটির সামনে থেকে সোহেল চাকমা ও জিকো চাকমা নামের দুই যুবককে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালান। এরপর সেনাসদস্যরা মাজলংয়ের শান্তিপাড়া গ্রামে হানা দিয়ে বাবু চাকমার বাড়ি ঘেরাও করেন। সেনারা যখন আরও কয়েকটি বাড়ি তল্লাশির উদ্দেশ্যে ঘেরাও করতে শুরু করেন, তখন এলাকার সাহসী নারীরা একত্রিত হয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হন।

তবে সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়নের মাত্রা ছাড়িয়ে যায় ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে। ওই দিন সকালে সাজেক ইউনিয়নের মাজলং চিল্যাতলি এলাকায় মিয়্যে রঞ্জন চাকমা নামের এক সাধারণ ব্যক্তির বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ আগস্ট জেএসএসএর সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর পাহারায় উদয়পুর ও কংলাক থেকে আসার পর থেকেই নিরাপত্তার কথা ভেবে মিয়্যে রঞ্জন চাকমা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাড়ি ফিরতে পারেননি। এরই মধ্যে ১৩ অক্টোবর সকালে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ওই এলাকায় অভিযান চালানোর নামে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে এবং চিল্যাতলি কুটিরের পাশে তার শূন্য বসতঘরটিতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

ছ) সাজেকবাসীর আন্দোলন, আল্টিমেটাম ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি

জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতা এবং সেনাসদস্যদের হয়রানির প্রতিবাদে সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির নেতৃত্বে এলাকাবাসী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।

প্রথম বিক্ষোভ (১ অক্টোবর):  

শিশু কস্মিতা ত্রিপুরা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক অশান্তি সৃষ্টিকারী সশস্ত্র গ্রুপকে মদত ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের প্রতিবাদে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে’ ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সাজেকের উজোবাজারে এক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। সমাবেশে কস্মিতা ত্রিপুরা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয় এবং এর জন্য জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের দায়ি করা হয়।

সমাবেশ শেষে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র কমান্ডার বিক্রম চাকমা ও অসিম প্রিয় চাকমা সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকারী স্থানীয় মুরুব্বী ও নেতৃবৃন্দকে টার্গেট করে মুঠোফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেন। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা, মিলন চাকমা, কার্বারী জ্যোতিলাল চাকমা এবং বিজয় কান্তি চাকমাকে ‘হিট লিস্টে’ রাখা হয়েছে জানিয়ে বলা হয় যে, ইউপিডিএফের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ না করলে তাদের হত্যা করা হবে।

দ্বিতীয় বিক্ষোভ ও ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম (৮ অক্টোবর)

১ অক্টোবরের সমাবেশে যোগ দেয়ার কারণে সাজেকের বিভিন্ন মুরুব্বী-কার্বারীদেরকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা প্রতিনিয়ত হুমকি-ধামকি দিতে থাকলে ৮ অক্টোবর “নিরাপত্তা বাহিনীর মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতায় জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সাজেকে অবস্থান এবং সাধারণ জনগণকে হত্যার হুমকি প্রদানের প্রতিবাদে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে” এক বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় তিন সহস্রাধিক সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। সমাবেশ থেকে ৪৮ ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রশাসন দাবি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে, এরপর ১১ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

অবরোধের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে বাঘাইহাট সেনা জোন থেকে প্রায় ৫০-৬০ জন সেনাসদস্য সাজেক উজোবাজারে হানা দেয়। তারা বাবুধন চাকমা, মিলন চাকমা ও বিজয় কান্তি চাকমার বাড়ি ও দোকানঘরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে তল্লাশির নামে ব্যাপক হয়রানি করে এবং প্রতিবাদ সমাবেশে ব্যবহারের জন্য রাখা চারটি হ্যান্ড মাইক জব্দ করে নিয়ে যায়।

সাজেকবাসীদের অবরোধ পালনের সময় বাঘাইহাট জোনের উপঅধিনায়ক মেজর সালমান সিদ্দিক ও পুলিশের কর্মকর্তারা এসে অবরোধকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দুই দিনের মধ্যে জনগণের উত্থাপিত তিন দফা শর্ত বাস্তবায়নের আশ্বাস প্রদান করেন। তার আশ্বাসের প্রেক্ষিতে ৪৮ ঘন্টার জন্য সড়ক অবরোধ স্থগিত করেন আন্দোলনকারীরা। ছবিতে মেজর মো: সালমান সিদ্দিককে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে।

এত ভয়ভীতি সত্ত্বেও সাজেকবাসী ১১ অক্টোবর থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক সড়ক অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন। অবরোধ চলাকালে বিকেলে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উজোবাজারে এসে আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনা করেন এবং অবরোধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান। সাজেকবাসীর পক্ষ থেকে তিনটি শর্ত পেশ করা হয়: প্রথমত, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক থেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সকল সশস্ত্র সন্ত্রাসীকে সরিয়ে নিতে হবে; দ্বিতীয়ত, সন্ত্রাসীরা কোনো প্রাণনাশের হুমকি দিতে পারবে না; এবং তৃতীয়ত, সেনা প্রশাসন কর্তৃক সাধারণ জনগণের ঘরে রাতে তল্লাশি চালানো যাবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই দিনের মধ্যে এসব দাবি বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় অবরোধ কর্মসূচি কেবল ৪৮ ঘণ্টার জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

সাজেকে অবরোধের চিত্র

২) দ্বিতীয় দফার অবরোধ: ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা পার হলেও মেনে নেওয়া তিনটি শর্ত পূরণে প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, উপরন্তু ১৩ অক্টোবর মাজলং চিল্লাতলি এলাকায় মিয়্যে রঞ্জন চাকমার বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই প্রেক্ষাপটে সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ১৫ অক্টোবর থেকে দ্বিতীয় দফায় লাগাতার সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়।

তবে ১৫ অক্টোবর অবরোধ চলাকালে বাঘাইহাট ও মাচলং বাজার পূজা উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অনুরোধ জানানো হলে, দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সাথে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় যে, এই সময়ের মধ্যে যদি প্রশাসন দাবি বাস্তবায়ন না করে, তবে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

৩) তৃতীয় দফার অবরোধ এবং সেনাবাহিনীর বর্বর হামলা (২২ অক্টোবর): দুর্গোৎসবের কারণে অবরোধ বন্ধ থাকার সময়ে প্রশাসন সাজেকবাসীর দাবি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২২ অক্টোবর তৃতীয় দফায় পুনরায় অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। এদিন সকাল থেকে সাজেকের উজোবাজারসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে সাধারণ জনতা শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ শুরু করলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে সাজেক ভ্যালী পর্যটন থেকে পর্যটকদের গাড়ি বহর নিয়ে এসে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এ সময় তারা অবরোধ পালনকারী জনতার সাথে কথাবার্তা বলতে থাকে। তবে জনতা অনঢ় অবস্থানে থাকলে এক পর্যায়ে জনৈক সেনা কমান্ডার (মেজর)-এর নির্দেশে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অবরোধ পালনকারী জনতার ওপর হামলা, বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পর তারা পর্যটকদের গাড়িবহর খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নিয়ে যায়।

সাজেকের উজোবাজার এলাকায় শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালনকালে সেনাবাহিনীর হামলায় আহদের মধ্যে কয়েকজন।

সেনাবাহিনীর এই হামলায় নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশুসহ অন্তত ৭৮ জন সাধারণ মানুষ আহত হন। অনেকের হাত-পা ভেঙে যায় এবং অনেকে লাঠির আঘাতে জখম হয়। এরপর নিজেদের অপরাধ ঢাকতে সেনাবাহিনী সেখানে বিভিন্ন স্থান থেকে একতরফাভাবে গুলি ছুঁড়ে সাজানো ‘গোলাগুলি’র নাটক মঞ্চস্থ করে, যাতে সাধারণ মানুষ ভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

হামলার পর সেনাবাহিনী পুরো উজোজাজার দখল নিয়ে দোকানপাট-বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এতে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয় বলে জানা গেছে।

এছাড়া, এদিন খাগড়াছড়ি থেকে ফেরার সময় উজোবাজাারে সেনা সদস্যরা সমাপ্তি চাকমা নামক এক নারীকে অমানুষিকভাবে শারীরিক নির্যাতন করে। এরপর ২৫ অক্টোবর লাদেন চাকমা নামে এক ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালে যওয়ার পথে উজোবাজারের পার্শ্ববর্তী কাচলং সেনা ক্যাম্পে আটকিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাাকে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালায়।

উক্ত ঘটনা ছাড়াও সেনারা ১১ অক্টোবর অবরোধের সময় সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দেওয়া এসএসসি পরীক্ষার্থী শিক্ষার্থী ঝর্ণা চাকমাকে হয়রানি ও আটকের চেষ্টা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।  

জ) সরকারি প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনা ও বৈঠক

১. বৈঠকের প্রেক্ষাপট ও সময়কাল: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ সোমবার বিকেল ৩টার দিকে উজো বাজারে সরকারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আন্দোলনকারী নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাজেকবাসী সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা এই বৈঠক কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।

২. প্রতিনিধি দল: বৈঠকে সাজেকবাসীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন বাবুধন চাকমা, নতুন জয় চাকমা, উষাতন চাকমা, জিকো চাকমা ও সাধনা দেবী চাকমা। সরকারি দলের নেতৃত্ব দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া। এছাড়া রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান এবং দুই জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারগণ উপস্থিত ছিলেন।

৩. পাঁচ দফা দাবি: সাজেক থেকে সশস্ত্র সদস্যদের অবিলম্বে অপসারণ, ২২ অক্টোবরের ঘটনায় নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দায়ী সেনা কর্মকর্তাদের শাস্তি ও বদলি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং সেনা-পুলিশ প্রত্যাহার ও হয়রানি চিরতরে বন্ধ করা।

৪. বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার কারণ: বৈঠকে সরকারের প্রতিনিধি দলটি সাজেক থেকে সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিন সপ্তাহ সময় চায়। কিন্তু আন্দোলনকারী নেতারা এই দীর্ঘ সময়ের প্রস্তাবে রাজি না হয়ে সর্বোচ্চ পাঁচদিনের সময়সীমা বেঁধে দেন। সাজেকবাসীর মূল দাবি পূরণে সরকার পক্ষের অনমনীয়তার কারণে বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলস্বরূপ, অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।

খ) সাজেক সংকটে প্রশ্নবিদ্ধ সন্ত্রাস দমনে সেনাবাহিনীর অঙ্গীকার ও ভূমিকা

সরকারি দলের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দের বৈঠক। স্থান: উজোবাজার, সাজেক, রাঙামাটি।

সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অঙ্গীকার ও ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়। সেনাবাহিনী যেভাবে একটি সশস্ত্র গ্রুপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বা প্রশ্রয় দিচ্ছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

১. সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় ও রসদ সরবরাহ: মাচলং আর্মি ক্যাম্পের অত্যন্ত কাছে জেএসএস (সন্তু গ্রুপ)-এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অবাধে অবস্থান নিলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো সেনাসদস্যদের পক্ষ থেকে সেই সন্ত্রাসীদের জন্য খাদ্য, পানি ও রসদ সরবরাহ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে আলোচনায় এই তথ্যের সত্যতার প্রমাণ মিলেছে।

২. অপরাধী ও অপহৃত ব্যক্তিকে রক্ষায় গোপন সমঝোতা: ফেরদৌস চাকমা অপহরণের ঘটনায় অপহৃতের পরিবার মামলা করতে যাওয়ার পথে সেনাসদস্যরা পথরোধ করে এবং জেএসএস কমান্ডারকে ফোনে বকাঝকা করে নাটক সাজায়। পরবর্তীতে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমেই অপহৃত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে এনে ‘উদ্ধার’ করার ভুয়া নাটক মঞ্চস্থ করা হয়।

৩. সেনাক্যাম্পের কাছে অপরাধ সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও নীরবতা: মাচলং নোয়াপাড়ায় শিশু কস্মিতা ত্রিপুরা গুলিতে গুরুতর আহত হওয়া কিংবা জুমচাষীদের ওপর হামলার ঘটনায় সেনাক্যাম্পগুলো কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ক্যাম্পের এত কাছে অস্ত্রধারীদের গুলিবর্ষণের পরও সেনাবাহিনীর নীরব দর্শকের ভূমিকা পালনের অর্থ দাঁড়ায় সন্ত্রাসীদের প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে।

৪. সাধারণ জনগণের আন্দোলন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর দমনপীড়ন: ‘সাজেক কলেজ’ চালুর উদ্যোগকে নস্যাৎ করতে সেনাবাহিনী সরাসরি বাধা দেয় এবং সেনা কর্মকর্তাকে পর্ষদের সভাপতি করার জন্য কঠোর চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সেনাসদস্যরা লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে শতাধিক মানুষকে আহত করে এবং রাতে বাড়িঘরে তল্লাশি চালায়।

৫. সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সাধারণ মানুষের ঘরে অগ্নিসংযোগ: সাজেক থেকে সন্ত্রাসীদের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে সেনা কর্তৃপক্ষ সন্তু গ্রুপের সন্ত্রাসীদের সরিয়ে না দিয়ে উল্টো মাচলং চিল্লাতুলি এলাকায় মিয়্যে রঞ্জন চাকমার বসতঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত সাজেকবাসীর ওপর হামলা চালায়। সন্ত্রাসীদের নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে দেওয়াসহ সাজেকের চলমান ঘটনাবলী এটা স্পষ্টভঅবে প্রমাণ করেছে যে, নিরাপত্তা বাহিনী সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার পরিবর্তে একটি বিশেষ সশস্ত্র গোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করছে।

গ) উপসংহার: সাজেকের কান্না ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষা

সাজেক উপত্যকার সাম্প্রতিক ঘটনাবলী কোনো বিচ্ছিন্ন সংঘাত নয়; এটি একটি পুরো অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ও আত্মমর্যাদার ওপর নেমে আসা গভীর ট্র্যাজেডি। সাজেক কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ থেকে শুরু করে জুমচাষীদের ওপর হামলা, শিশু কস্মিতা ত্রিপুরার গুলিবিদ্ধ হওয়া, রাতের আঁধারে তল্লাশি এবং ২২ অক্টোবরের পৈশাচিক হামলার চিত্র প্রমাণ করে যে সাজেকের সাধারণ মানুষের জীবন আজ সেনাবাহিনী ও সন্তু লারমা দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসের কাছে চরমভাবে জিম্মি।

প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক ও আল্টিমেটাম দেওয়ার পরও যখন সরকারপক্ষ বা সামরিক প্রশাসন সাজেক থেকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন তা তাদের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সন্তু লারমার সশস্ত্র গ্রুপকে সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যে উদ্দেশ্যই হাসিল করতে উদ্যোগী হোক, এটা সত্য যে, এতে সাজেকবাসীর মানবাধিকারের প্রতি চরম অসম্মান ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়েছে।

আজ সাজেকের প্রতিটি মানুষের মনে একটি মাত্র প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনী কি তবে সাধারণ নাগরিকের সুরক্ষার পরিবর্তে সন্ত্রাসের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে? সেনাবাহিনী এভাবে সন্ত্রাসের পক্ষে অবস্থান নিলে সাধারণ জনগণ তাদের নিরাপত্তার জন্য কার কাছে দ্বারস্থ হবে? এ অবস্থায় সাজেকের চলমান সংকট নিরসনের জন্য সরকারের কাছে আমাদের কিছু সুপারিশ তুলে ধরছি।

১) সন্ত্রাসের বিপক্ষে সরকারের দৃশ্যমান দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা এবং সাজেকবাসীর দাবি মেনে নিয়ে জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া।

২) চলমান সাজেক সংকট নিরসনের জন্য সাজেকবাসীর প্রতিনিধির সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখা।

৩) প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে সন্তু লারমা কর্তৃক সশস্ত্র দল পরিচালনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধও। তাই, এ বিষয়ে সন্তু লারমার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সাজেক থেকে তার সশস্ত্র সদস্যদেরকে সরিয়ে নিতে চাপ প্রয়োগ করা অথবা তার সশস্ত্র সদস্যদের নিষ্ক্রিয় করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

৪) শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ চলাকালে ২২ অক্টোবর আন্দোলনকারীদের ওপর বিনা উস্কানিতে হামলার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও শাস্তি প্রদান, আহতদের সুচিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৫) সাজেকসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা।


মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সেল
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)

* রিপোর্টটির পিডিএফ লিঙ্ক এখানে